সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

মাদককে না বলুন... ...

১.
SSC, HSC-তে দুইবার Board Stand করার Brilliant Result নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম ভার্সিটিতে। বেশ ভালই কাটছিল দিনগুলো। পড়াশুনাটা খুব ভালই চলছিল প্রথম দিকে। কিন্তু আজ? হায়, এ আমি কি করলাম!!!
২.
স্কুলজীবন থেকে চলে আসা আমার আর নিনতার প্রেমটা ততদিনে বিশালত্বের রূপ নিয়েছে। ইস, দুজনের কত স্বপ্ন! জীবনটাকে তখনো খুব রঙিন মনে হত। ভার্সিটির এক-একটা দিন মনে হত এক-একটা স্বপ্নের মত। কিন্তু হঠাৎই এক হরতালে, বোমাবাজিতে নিনতা নিহত হল। আমার স্বপ্নের পৃথিবীতে নেমে এল চিরদিনের সূর্যগ্রহণ। বন্ধুরা কেউ কেউ বলল, "ভুলে যা ওসব, ভার্সিটিতে অমন হাজারটা সুন্দরী মেয়ে পাবি, নে ধর... ..." বিষণ্ণতা ভুলতে হাতে তুলে নিলাম ্ওদের এগিয়ে দেয়া সিগারেট। বাবা-মায়ের সমস্ত আদেশ-উপদেশ, স্বপ্নকে চুরমার করে; হারিয়ে যাওয়া নিনতার রেখে যাওয়া সমস্ত ভালবাসা উপেক্ষা করে, আমার সিগারেট ফুলে ফেঁপে মদের বোতলে পরিণত সময় লাগল মাত্র ছ'মাস। সময়-সুযোগমত সমাজের একদল সাধু-সন্ন্যাসীর কালোথাবায় মায়ের দেয়া পবিত্র কলমের জায়গাটা লুফে নিল কিছু ভারী অস্ত্র। সময়ের অল্প ব্যবধানে আমি হয়ে উঠলাম বোর্ডস্ট্যান্ড করা সন্ত্রাসী "স্ট্যান্ড তারিক"... ...
নিনতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীটা আজও মনে আছে। সেদিনও হরতাল। অস্ত্র আর বোমা সহ আমি ধরা পড়লাম পুলিশের হাতে। কিন্তু টেলিফোন আর মোবাইলের কল্যাণে আমার জেলমুক্ত হতে সময় লাগল মাত্র তিনদিন। কিন্তু জেলের দুইটা রাতই আমার হৃদয়ে তুলে ধরল আমার ফেলে আসা দিনগুলি। বারবারই কেবল শুনতে পাচ্ছিলাম মা বলছে, "খোকা, এই কি তোর পড়াশুনা !" যেন নিনতার আত্মা আমায় ঘৃণায় ধিক্কার করছে, "ছি! এই কি আমার জন্যে তোমার ভালবাসা ?" আমি ভাল হবার পণ করলাম। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে ছুটে চললাম বাড়ির দিকে। কিন্তু বাড়িতে আর ঢোকা হল না। কারণ, আমার সুকীর্তির চিত্রটা টেলিভিশনে দেখার পরমুহূর্তেই বাবা হার্টঅ্যাটাকে মারা যান। মা আমাকে দেখেই দূর থেকে চিৎকার শুরু করেন, 'এমন ছেলেই কি আমি গর্বে ধারণ করেছিলাম !!' কিছুতেই স্পর্শ করতে দিলেন না বাবার কবরটা। ছোটবোন আশা একটু কাছে এসে বলল, "ভাইয়া, তুই চলে যা। তোকে বেশিক্ষণ চোখের সামনে দেখলে হয়ত মাও হার্টঅ্যাটাক করবে।" আর দাড়িয়ে থাকার সাহস হল না। কলঙ্কিত মুখটা কোনমতে গোপন করে বেড়িয়ে এলাম বাড়ি থেকে। কিন্তু সমাজ আমার ভাল হবার সব ক'টা পথ ততকদিনে বন্ধ করে দিয়েছে। অবশেষে রাস্তার মোড়ে মোড়ে অর্ধউন্মাদ অবস্থায় ঘুরতে লাগলাম। আমার জীবন নদীর দু'কূলেই ভাঙন ধরল।
৩.
অনেক বছর পর, একুশে বইমেলার গেটে দাড়িয়ে ছিলাম অন্যমনস্কভাবে। হঠাৎ একটা মেয়েকে দেখে চমকে উঠলাম, পাশে দাড়িয়ে থাকা লোকটা বোধ হয় ওর Husband, আর সঙ্গের পিচ্চিটা মনে হয় ওর সন্তান। কাছে গিয়ে খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, " আশা, মা কেমন আছে?" আমার ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে হাহাকার করে উঠল, কিন্তু পারলাম না। কারণ, পাশের ঐ লোকটা যখন জানতে চাইবে 'আমি কে'; তখন কী জবাব দেবে আশা??? তাই আজ সমাজের সকল ছদ্মবেশী সাধু-সন্ন্যাসীদের কাছে আমার অনুরোধ, "দয়া করে পবিত্র বিদ্যাপীঠগুলোকে কলুষিত করবেন না... ।" আর পৃথিবীর সমস্ত তারুণ্যের কাছে আমার আবেদন, "মাদককে না বলুন... ..."

লেবেলসমূহ: ,

মৃত্যু-লটারি

প্রতিদিনের মতই লটারির টিকিটের নম্বরটা গুণতে গুণতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে আমি টিউশনিতে যাচিছ। বাসা থেকে বের হবার সময় শয্যাশায়ী মা বলেছিলেন, "বাবা, একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস, মনটা কেমন যেন করছে।" গত দুই বছর ধরে শয্যাশায়ী মা, আদরের ছোটবোন আর আমি, তিনজনের ছোট্ট সংসারের ভারটা আমাকেই বইতে হয়। নিজের ভার্সিটির খরচ, ছোটবোনের পড়াশুনা, মায়ের চিকিৎসা- এসবের একমাত্র অবলম্বন আমার টিউশনি।বাবার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই, সংসারের খরচ যোগানোর প্রচণ্ড পরিশ্রমে মায়ের ডান কিডনীতে ব্যাথ্যা শুরু হয়। এখন দু বছরে প্রায় দুটো কিডনীই অচল! হয়ত মা আর বেশি দিন বাঁচবে না। ডাক্তার বলেছিলো, মাকে পুরো সুস্হ করতে প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা লাগবে। কথাটা শোনার পর থেকেই আমার লটারি কেনার শুরু, ৪০ লাখ টাকার লটারি, যদি লাইগ্গা যায়!! বলা যায়, মায়ের জীবন নিয়ে লটারি খেলছি!একবার প্রায় মিলেও গিয়েছিলো, শুধু শেষের ডিজিটটা.........., হতভাগা সন্তান আমি!!
বড়লোকের নার্সারিপড়ুয়া মেয়েকে পড়াই আমি, মাস মাইনে ৬০০০ টাকা, আমাদের অবলম্বন। কিছুক্ষণ পড়ানোর পড়েই মেয়েটা বলল,"স্যার, আপনার লটারি মেলাবেন না? আজতো পেপারে লটারি ড্র'র রেজাল্ট দিয়েছে।" আমার লটারির খবর এদেরও অজানা নেই, শুধু লটারি কেনার কারণটাই কেউ জানে না। মনটা ছটফট করে উঠলেও শীতল কণ্ঠে বললাম, মেলাব। "তাহলে আপনি লটারি মেলাতে যান, আমি গিয়ে কার্টুন দেখি," বলেই মেয়েটা চলে গেল। আমি ছুটলাম পাবলিক লাইব্রেরির দেয়ালে টাঙানো পেপারটার উদ্দ্যেশে। পথেই দেখা নীলার সাথে...
: মা কেমন আছে? জানতে চাইল ও।
-ভাল।
:তোমাদের ওখানেই যাচ্ছিলাম, তুমি বাসায় যাবে না? চলো ... ...।
-তুমি যাও, আমি একটু পরে আসছি।
বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে নীলা; আমাকে একদিন বলেছিলো, "আমি তোমাকে ভালবাসি।তুমি আমাকে ভালবাসার অধিকারটা দেবে?" আমি ওকে পুরো অবস্থাটা বোঝালাম, তারপর বললাম,"তা হয় না।" তারপর থেকেই আমাদের বাড়িতে ওর আসা-যাওয়া। মাঝে মাঝে মায়ের জন্যে কিছু ওষুধ নিয়ে আসা, পাশে বসা, মায়ের হাত ধরে কিছু কথা বলা ... ...। মাও ওর সঙ্গটা বেশ উপভোগ করে। আমি ওকে আসতে নিষেধ করি, মনে করিয়ে দেই,"আমি কখনোই তোমাকে ভালবাসি নি, এখনো বাসি না।" তবুও ও আসে। হয়ত এখনো ভালবাসে আমাকে। মন থেকে ওর ভালবাসাটা আজও মেনে নিতে পারি না, কারণ সেটা সাজে না। মায়ের চিকিৎসার টাকাটাও দিতে চেয়েছিলো দু'একবার, রাজি হইনি। যাকে ভালবাসি না, তার ভালবাসার সুজোগ নিয়ে প্রতারণার টাকায় মায়ের চিকিৎসা করাতে বিবেক সায় দেয়নি। তবে আজ কেন যেন মনে হচ্ছে, আর কোন পথ খোলা নেই, এবার নীলার কাছেই চাইব টাকাটা। ভাল নাইবা বাসলাম, টাকাটাতো পাব, মায়ের চিকিৎসাতো হবে। এসব ভাবতে ভাবতে চলে এলাম পাবলিক লাইব্রেরির সামনে। নাহ, মিলল না প্রথমটা। ৪০ লাখ গেল ... ... । তবে অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ২৫ লাখ টাকার ২য় পুরস্কারের নম্বরটা আমার মিলে গেল। হাসবো না কাঁদবো, বুঝলাম না। আনন্দে লাফাতে লাফাতে দীর্ঘ দেড় বছর পরে আজ রিকসায় উঠলাম; গন্তব্য: বাসা, শয্যাশায়ী মায়ের মুখ।


কী ব্যাপার? এত ভীড় কেন?
ভীড় ঠেলে ছোটবোনটা এগিয়ে এল, "ভাইয়া, মা আর নেই... ...।"
আমি শুধু জানতে চাইলাম, "কখন গেলরে?"
"অনেকক্ষণ তোর নাম ধরে ডাকছিলো, শেষ পর্যন্ত আর থাকতে পারল না ... ...," ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ও।
আমি ভেতরে এগিয়ে গেলাম, মায়ের প্রাণহীণ দেহটা কাপড়ে ঢাকা, পাশে বসে আছে নীলা, তার চোখেও জল।কোন কথা বলতে পারলাম না, শুধু চেয়ে রইলাম... ... শুধুই নির্বাক দৃষ্টি।


জানাযার পরে মাকে দাফন করা হল। সবাই মুঠোমুঠো মাটি দিয়ে একে একে চলে গেল; নির্বাক আমি একাকী দাড়িয়ে। ছোটবোনটা পাশে এসে দাড়াল, চোখ দুটো তখনও জলে ভেজা। আমি পকেট থেকে লটারির কাগজটা
বের করে মায়ের কবরের উপর বিছিয়ে দুমুঠো মাটি দিয়ে ঢেকে দিলাম, মনে মনে বললাম, "রাব্বিরা হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগীরা... ...।" ছোটবোনটার অশ্রুজল তখনো মায়ের কবরটা সিক্ত করে চলছে... ... ...।



[১১মে, "বিশ্ব মা দিবস," আমার এই গল্পটা আমাদের সকল ক্যাডেট মায়েদের উৎসর্গ করছি যারা সেই ছোট্ট ক্লাস সেভেন পড়ুয়া সন্তানটির জন্যে সারাক্ষণ দু:শ্চিন্তায় থাকতেন, তার পথ চেয়ে দিন গুণতেন।]

লেবেলসমূহ: ,

আত্মার ডায়রি থেকে: শুধু একটু আদর

১.
"" আমার ভালবাসা, আমার প্রাণপ্রিয়,
এত আনন্দ আমি কীভাবে যে তোমাকে বোঝাব! কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলছি, তোমার একটা মেয়ে হয়েছে, এরকবারে চাঁদের মত সুন্দর। তুমি বাবা হয়েছ, আর আমি - মা। জানো লক্ষ্মীটি, তোমার মেয়ে একেবারে তোমার মত হয়েছে, তোমার মত ওর কপালের ডানপাশেও একটা তিল আছে। কিন্তু মেয়েটা সারাক্ষণ শুধু কাঁদে, মনে হয় বাবার আদর পেতে চায়। please লক্ষ্মীটি, জলদি চলে আস। জলদি ,জলদি...........।
ইতি
তোমার ভালবাসা, তোমার প্রিয়া ""

ঢাকা থেকে স্ত্রীর পাঠানো এই চিঠিটা লাহোর ক্যান্টনমেন্টে বসে আমি ক্যাপ্টেন সুমন যেদিন receive করেছিলাম তখন '৭১এর ফেব্রুয়ারি। প্রিয়ার ইচ্ছে ছিল, ছেলে হলে পাইলট বানাবে, মেয়ে হলে ডাক্তার। তাই মেয়ের কথা ভাবতেই আমার চোখের সামনে একটা স্বপ্ন ভেসে এল। আমার মেয়ে নামকরা ডাক্তার হবে। মেয়েকে এক নজর দেখার জন্যে ছুটি manage করতে সচেষ্ট হলাম। কিন্তু পারলাম না, শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। বন্ধ করে দেয়া হল বাঙালিদের পূর্বপাকিস্তানে ফিরে আসা। দেশের টানে পাকিস্তান ছেড়ে পালালাম আমরা সেনাবাহিনীর কয়েকজন। বাড়িতে একবার মেয়েটাকে দেখেই যোগ দেব যুদ্ধে- এটাই ছিল ইচ্ছা। কিন্তু ঢাকার খুব কাছাকাছি এসেও বাড়িতে যাবার ইচ্ছেটা ত্যাগ করতে হল দেশের টানে - 'এদিকটা তখন হানাদারদের দখলে; মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ নয়।' ফুটফুটে মেয়েটাকে একটু আদর দেয়ার ইচ্ছা সুপ্ত রেখেই যোগ দিলাম মুক্তিফৌজে। এরপর দীর্ঘ প্রতীক্ষা। প্রিয়ার ঐ চিঠিটা বুকে নিয়ে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ালাম দেশের এপাড় থেকে ওপাড়। চোখে বাংলামায়ের স্বাধীনতার নেশা; মনে ছোট্ট মেয়েকে আদর দেবার প্রত্যাশা। যুদ্ধের মাঝে প্রায় রাতেই আকাশের চাঁদ দেকে ভাবতাম, 'ঐ তো আমার মেয়ে।'
যুদ্ধের শেষদিকে অক্টোবরে ৯নং সেক্টরে যুদ্ধরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আমি পঙ্গু হয়ে গেলাম। কোনমতে সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও এই ব্যথাটাই একদিন আমাকে মরণের ডাক দিয়েছিল। যুদ্ধের বাকিটা সময় সেনাবিহনীর অধীনে চিকিৎসারত ছিলাম। যুদ্ধ শেষে ডিসেম্বরে ফিরে চললাম নিজের বাড়ির দিকে। চোখে রঙিন স্বপ্ন; একটা নতুন দেশ, নতুন পতাকা আর প্রিয়ার কোলে একটা নতুন মানুষ। এত নতুনের আনন্দে পঙ্গুত্বের কষ্টটা আর আমার মনে স্থান পায়নি। কিন্তু হায় ! এ কি ! কোথায় বাড়ি, এ যে ধ্বংসস্তুপ। প্রিয়ার বদলে শোক সংবাদ; "আমার প্রিয়ার ক্ষতবিক্ষত লাশটা নাকি বিবস্ত্র অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল রাজাকারদের ঘাটির পিছনে।" আর আমার মেয়ে ? ? যুদ্ধ তার কোনো সন্ধান দিতে পাড়েনি। কী দোষ ছিল আমার ছোট্ট মেয়েটার ? কী অপরাধ ছিল আমার প্রিয়তমার ?


২.
কেটে গেছে প্রায় ২৫টি বছর। এই বুড়ো পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার ক্ষতস্থানটায় পছন ধরেছে। আমি ঢাকার P.G. হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বুঝতে পাড়ছিলাম জীবনের শেষ দিন আসন্ন। জীবনের সব হারিয়ে এখন নিজেকে হারাতে পারলেই আমি বেঁচে যাই। কিন্তু হায় ! জীবনের শেষ দিনগুলিতে জীবনের প্রতি একটা পড়ে গেল। কারণ - আমার চিকিৎসায় কর্তব্যরত ডাক্তার মেয়েটা। ওর পরম সেবা শুশ্রূষা আমাকে বারবার মনে করিয়ে করিয়ে দিতে লাগল প্রিয়ার সেই কথাগুলো - " মেয়ে হলে ডাক্তার বানাবো ।" অবশেষে একদিন মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বললাম, তুমি কে মা? কেন মিছিমিছি এই বুড়োর জন্য এত কিছু করছ ?
: ছোটবেলায় যুদ্ধে বাবাকে হারিয়েছি, তাই আপনার মত বাবর বয়েসি কারও কষ্ট দেখলে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনা।
চোখের জল লুকিয়ে বড় আবদার নিয়ে বলেছিলাম, ' একটু কাছে আসবে মা, তোমার কপালে একটা আদর দিব।' কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, আজরাইল আমার প্রাণপাখিটা টানাহেচড়া শুরু করেছে। আমি উঠে বসতে ছেষ্টা করলাম, ওর কপালটা আমার মুখের কাছে আসেতই আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল, " হে আল্লাহ, আমি বাঁচব , আমাকে আর একটিবার শক্তি দাও।" কারণ, ওর কপালের ডানপাশে একটা তিল ছিল। কিন্তু আমার ওষ্ঠাধর ওর কপাল স্পর্ষ করার আগেই আমি প্রচণ্ড ব্যথায় বিছানায় লুটিয়ে পড়লাম। আমার প্রাণপাখি উড়ে চলল পড়পাড়ের উদ্দ্যেশে। আর উঠে বসা হল না, শত স্বপ্নের মেয়েকে এত কাছে পেয়েও দেয়া হল না কাঙ্ক্ষিত সুপ্ত আদরটা।

পরিশিষ্ট:
এখনও ডা. তাজনিন তার বাবার কোন সঠিক পরিচয় জানেন না, শুধু এতেটুকুই জানেন যে তার বাবা তৎকালিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন এবং যুদ্ধের পড়ে তার আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবুও বাবার কথা মনে হলেই তার বুকটা হাহাকার করে ওঠে, চোখের সামনে কেবলই ভেসে ওঠে, একজন বৃদ্ধ তার কপালে আদর দিতে গিয়েই চমকে উঠেছিলেন, মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়লেন মৃত্যুর কোলে।
আচ্ছা, মৃত্যু পথযাত্রী ঐ বুড়ো কী করে sure হয়েছিলেন যে এই তাজনিনই তার মেয়ে ?
একটা তিলই কি সব পরিচয় নিশ্চিত করে ? হয়ত করে না।
তবুও একটা অচেনা মেয়েকে নিজের মেয়ে ভেবে মনে শান্তি পেতে ক্ষতি কী.............
তবুও একটা অচেনা বুড়োকে নিজের বাবা ভাবতে ক্ষতি কী..........

লেবেলসমূহ:

বিবিসি বাজার: মুক্তিযুদ্ধের অজানা কাহিনী ...

জায়গার নাম বিবিসি বাজার। তাই বলে জায়গাটা কিন্তু লন্ডনে নয়। এমনকি সেখানে কোন বেতার কেন্দ্র কিংবা বেতার উপকেন্দ্রও নেই। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আর সেই যুদ্ধে বৃটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)-এর গৌরবময় স্মৃতি ধারণ করে ধন্য আজকের বিবিসি বাজার। ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপূর বাজারের নাম হয়েছে বিবিসি বাজার। এই বাজারের নেপথ্য নায়কের নাম আবুল কাশেম মোল্লা।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রূপপুর এলাকাটি বেশ জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। এর সন্নিহিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং পাকশী পেপার মিল- দুটোই ছিল পাকবাহিনীর বিশাল বহরে সজ্জিত।ঘন গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান রংপুর কড়ই তলায় গ্রামের যুবক আবুল কাসেম মোল্লা এপ্রিল(১৯৭১) মাসের প্রথম দিকে একটি চায়ের দোকান দেন। দোকানে ছিল একটা থ্রিব্যান্ড রেডিও। যে সময়ে পাঁচ গ্রাম ঘুরে একটি রেডিও পাওয়া যেত না সেই সময়ে একটি থ্রিব্যান্ড রেডিওর মালিক হওয়া ছিল রীতিমত গর্বের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর শোনার জন্য তিনি বিবিসি ধরতেন। লোকজন কড়ই তলায় চা খাওয়ার নাম করে যুদ্ধের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেত। তাদের আলোচনার খোরাগ যোগাত বিবিসির খবর। ধীরেধীরে লোকসমাগম বাড়তে লাগল। বেশিরভাগ লোকই আসত যুদ্ধের খবরাখবর শোনার জন্য। কয়েক মাসের মাসের মধ্যে লোকজন রূপপুর বাজারের নাম পরিবর্তন করে রাখল বিবিসি বাজার। স্বাধীনতার পর জায়গাটির নাম স্থায়ীভাবেই বিবিসি বাজার বলে পরিচিত পায়।
দেশ স্বাধীনের পর সারা জেলায় বিবিসি বাজারের কাহিনী ছড়িয়ে যায়। বিবিসি কতৃপক্ষের কানেও পৌছে যায় কাসেম মোল্লার বিবিসি বাজারের কাহিনী। ১৯৯২ সালে বিবিসির পঞ্চাশ বছর পূর্তি তাদের একটি দল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান সফরে আসে। এই প্রতিনিধি দল বিবিসি বাজার পরিদর্শন করে। তাদের সম্মানে এলাকাবাসী প্রাণঢালা সংবর্ধনার আয়োজন করে। প্রতিনিধি দলও অনুরূপ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।
স্বাধীনতার এত বছর পর বিবিসি বাজার চিনলেও অনেকেই জানেন না এর গোড়ার কথা। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলিতে যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কিংবা বিবিসির অনুষ্ঠান শোনা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, রাজাকার-আলবদরের কোপানলে পড়ার সমূহ আশংকা ছিল, এই মহা আশংকার কথা জেনেও ভরা বাজারে বসে শুধু নিজেই শোনেননি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কিংবা বিবিসির অনুষ্ঠান, অন্য শতজনকেও পৌছে দিয়েছেন সেই সংবাদ। এটা কি কম সাহস কিংবা দেশপ্রেমের কথা?


[পুরোনো কোন পত্রিকার একটা ছেঁড়া পাতায় লেখাটা পড়েছিলাম, সেখানে লেখকের নাম ছিল আমিনুল ইসলাম জুয়েল। সবার সাথে শেয়ার করলাম।]